
স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন লন্ডন প্রবাসী নেতা ইয়াসের খান চৌধুরী। তার মনোনয়ন ঘোষণার পর স্থানীয় বিএনপির বড় অংশে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দলীয় ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে টানা বিক্ষোভ,মানববন্ধন ও অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। অন্যদিকে ভোটের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতপন্থীরা আনন্দ প্রকাশ করছে।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করা ইয়াসের খান দলের আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক হাসিনা বিরোধী কর্মসূচির সময়ও তিনি এলাকায় উপস্থিত ছিলেন না। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় তিনি চিকিৎসার অজুহাতে থাইল্যান্ডে অবস্থান করলেও নেতাকর্মীদের কাছে নিজেকে ঢাকায় রয়েছেন বলে দাবি করতেন।
চলতি বছরের শুরুতে “অদৃশ্য প্রভাবের জোরে” লন্ডনে বসেই তিনি নান্দাইল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদ পান। দায়িত্ব পাওয়ার পর সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে তিনি এলাকায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। পুলিশ পাহারায় নিজ বাড়িতে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানও ভেস্তে যায়। আন্দোলনরত বিএনপি নেতাদের চাপের মুখে তিনি ঢাকা ফিরে যান এবং দলীয় বড় কোনো কর্মসূচি ছাড়া এলাকায় আর যাননি। মনোনয়ন পাওয়ার সাত দিন পর এলাকায় গেলেও তীব্র বিক্ষোভের কারণে প্রকাশ্যে গণসংযোগ করতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনসম্পৃক্ততা ও তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগহীন এই নেতার মনোনয়ন এলাকায় বিস্ময় ও হতাশা তৈরি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপির কমিটিতে আওয়ামী লীগের কর্মীদের পদ দিয়ে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছেন। এতে ভোটের মাঠে আরও সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি হয়েছে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীর।
অপরদিকে নান্দাইল বিএনপিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছয়জন নেতা এবারের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মামুন বিন আবদুল মান্নান। টানা ১৬ বছর মাঠে থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার জন্য তিনি এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেন।করোনাকালে প্রায় ৩০ হাজার পরিবারকে সহায়তা করেছেন,আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রতিটি বাজার ও গ্রামে গণসংযোগ করেন এবং ১০৫১ মসজিদের ইমাম, ১৭৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪৪টি হাইস্কুল, ৩৩টি মাদরাসা ও ৬টি কলেজে ছাতা বিতরণ করেন। তৃণমূলে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
মনোনয়ন বঞ্চিত চারজন নেতা গত ১২ নভেম্বর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানান। সোমবার নান্দাইল উপজেলা সদরে শত শত নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আবারও বিক্ষোভ,মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।প্রতিবাদকারীরা বলেন,“দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিল, তাদের মধ্য থেকে যে কাউকে মনোনয়ন দিলে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষকে বিজয়ী করব। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলবে।”
তারা আরও বলেন, “ক্লিন ইমেজের নেতা মামুন বিন আবদুল মান্নানকে মনোনয়ন দিলে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব ছাড়াই তৃণমূলের সকল নেতাকর্মী একসঙ্গে কাজ করতে পারবে।”
স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। ১৯৭৮, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থীরা, আর ১৯৮৮ সালে জয়ী হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী।দলীয় নেতারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে প্রচার চালিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জনসম্পৃক্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী ছাড়া বিএনপি এ আসনে হোঁচট খেতে পারে বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।