
মুফতি ওমর ফারুক জালালী
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর বহু বছর পর,অর্থাৎ হিজরি চতুর্থ শতকের দিকে,সর্বপ্রথম এই দিবস পালনের প্রচলন শুরু হয়। তবে এর ব্যাপকতা লাভ করে ফাতেমি ও আইয়ুবী শাসকদের আমলে। বিশেষ করে, সুলতান আবু সাইদ মুজাফফর উদ্দিন কুকবুরী,যিনি সালাউদ্দিন আইয়ুবীর ভগ্নিপতি ছিলেন, ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দে ইরাকে একটি বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি পালন করেন। তখন থেকে বিভিন্ন মুসলিম দেশে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
কীভাবে মিলাদুন্নবী পালিত হয়?মিলাদুন্নবী মূলত বিভিন্নভাবে পালন করা হয়।এই দিনে মুসলিমরা সাধারণত: নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করে।তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করে।গরীব ও দুঃস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ করে।বিভিন্ন স্থানে মিছিল বের করা হয় এবং তাঁর জন্ম ও জীবনের উপর ভিত্তি করে কবিতা ও গান পরিবেশন করা হয়।মিলাদুন্নবী নিয়ে বিভিন্ন মত
মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে কিছু ভিন্ন মত রয়েছে।ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা জায়েজ (বৈধ)যাঁরা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা জায়েজ মনে করেন, তাঁদের যুক্তি হলো:
আল্লাহর নেয়ামত প্রকাশের অংশ: তাঁরা বলেন যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট নেয়ামত। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “আর আপনার রবের নেয়ামতের কথা প্রচার করুন।” (সূরা আদ-দুহা, আয়াত ১১)। তাই এই নেয়ামত প্রকাশের জন্য ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা যেতে পারে।
ইতিহাসে এর প্রচলন: তাঁদের মতে,মুসলিম বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত হয়ে আসছে। এই প্রথাটি শুরু হয়েছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগে না হলেও পরবর্তী সময়ে এর প্রচলন ঘটে, যা মুসলমানদের মধ্যে নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে সহায়ক হয়েছে।বসবাসের স্থান: নবীর জন্মস্থান ও জন্মকাল: এই মতাবলম্বীরা বলেন, নবী (সা.)-এর জন্মস্থান ও জন্মকাল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ইবনে আবী শায়বা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, “রাসূলুল্লাহ (সা.)সোমবার রোজা রাখতেন এবং বলতেন যে,এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি।” এই হাদিস থেকে তাঁরা যুক্তি দেন যে,নবীর জন্ম দিবসকে স্মরণ করা বৈধ।বিদ’আতে হাসানা (ভালো বিদ’আত): কিছু আলেম ঈদে মিলাদুন্নবীকে বিদ’আতে হাসানা বা ভালো বিদ’আত হিসেবে গণ্য করেন। তাঁদের মতে, যে সকল নতুন কাজ ইসলামের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর, তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা জায়েজ নয় (অবৈধ)যাঁরা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা জায়েজ নয় মনে করেন,তাঁদের যুক্তি হলো:কুরআন ও হাদিসে কোনো নির্দেশনা নেই: এই মতের অনুসারীরা বলেন যে, ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন, সহিহ হাদিস, সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর আমল, তাবেয়ীন বা তাবে’ তাবেয়ীনের যুগে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা প্রচলন ছিল না। যদি এটি ভালো কাজ হতো, তাহলে নবী (সা.), খোলাফায়ে রাশেদীন এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিমরা অবশ্যই এটি করতেন।
ইসলামে উৎসবের সংখ্যা নির্দিষ্ট: তাঁরা বলেন, ইসলামে ঈদ (উৎসব) মাত্র দুটি, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এই দুটি ঈদ পালনের জন্য রাসুল (সা.) সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এর বাইরে কোনো দিবসকে ঈদ হিসেবে পালন করা বিদ’আত (ধর্মের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়)।ধর্মীয় বিষয়ে সংযোজন: এই মতের অনুসারীরা মনে করেন,ধর্মের মধ্যে নতুন কোনো বিষয় সংযোজন করা বিদ’আত এবং তা ইসলামে নিষিদ্ধ। সহিহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন উদ্ভাবন করে, যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৬৯৭)।
উপসংহার
এই বিষয়ে উভয় পক্ষই তাঁদের নিজস্ব যুক্তি এবং দলিল উপস্থাপন করে থাকেন। প্রথমোক্ত দল মিলাদুন্নবীকে নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপায় হিসেবে দেখেন, যা বৈধ। অপরদিকে, দ্বিতীয়োক্ত দল এটিকে ধর্মীয় বিষয়ে নতুন সংযোজন এবং বিদ’আত হিসেবে গণ্য করেন, যা অবৈধ। এই মতপার্থক্য দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম বিশ্বের আলেমদের মধ্যে বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে, একজন মুসলিম হিসেবে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে সঠিক তথ্য ও দলিল যাচাই করে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া।