
মশিউর রহমান সোহাগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরে অবস্থিত শতবর্ষী রামকানাই হাই একাডেমীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ ও মামলা বাণিজ্য সহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০১৬ সাল থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ রাজনীতিবিদদের যোগসাজসে তিনি এই দুর্নীতি ও অনিয়ম করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে বিদ্যালয়টির সংযুক্ত প্রাথমিক শাখার প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেতন ভাতা উত্তোলন করেছেন।এছাড়া ২০১৬ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আল মামুন সরকারের সহযোগিতায় রামকানাই স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আব্দুর নূরকে জামায়াতপন্থী আখ্যা দিয়ে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে প্রধান শিক্ষকের পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার মূল কারিগর তিনি।
২০১২ সালে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে অত্র বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন রফিকুল ইসলাম।কিন্তু আব্দুল নূর কে সরিয়ে দেওয়ার বছর না পেরোতেই সাজানো নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে কাঙ্খিত যোগ্যতা ছাড়াই প্রথমে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ এবং পরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদ বাগিয়ে নেন রফিকুল ইসলাম।২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করে আসছে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী। কিন্তু তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের আশীর্বাদ পুষ্ট হওয়ায় যে সকল শিক্ষক কর্মচারীরা তার বিরুদ্ধে গেছে তাদেরকেই মামলা হামলা সহ হতে হয়েছে নির্যাতনের শিকার। তার দ্বারা অত্যাচারিতদের মধ্যে রয়েছেন বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী আব্বাস উদ্দিন, লাইব্রেরিয়ান মোস্তাক আহমেদ এবং সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুর নূর সহ আরও অনেকেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রফিকুল ইসলামের সহকারী প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ পাতানো অবৈধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ব্যাপারে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রবিধানমালার অনুচ্ছেদ নং ১১(১৬) এর (ক) তে বলা আছে,কোন অনুচ্ছেদ বা উপানুচ্ছেদে যাই থাকুক না কেন প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে কাঙ্খিত শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে সমগ্র শিক্ষা জীবনে সর্বোচ্চ একটি তৃতীয় শ্রেণি বা সমমান গ্রহণযোগ্য হবে। অথচ স্কুলের ২০১২ সালের শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার নম্বর ফর্দ অনুযায়ী রফিকুল ইসলাম ১৯৯০ সালে রেফার্ড দিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে পাস করেছিলেন, এবং ১৯৯২ সালে থার্ড ডিভিশনে বিএ পাস করেছিলেন।রেফার্ড দিয়ে এইচএসসি পাশকে থার্ড ডিভিশনের চেয়েও নিচে বিবেচনা করা হয়। সে ক্ষেত্রে দুটি থার্ড ডিভিশন নিয়েও অবৈধভাবে রফিক ইসলাম সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ পেয়ে যান।এছাড়া রামকানাই স্কুলের উক্ত নিয়োগ কালীন সময়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুযায়ী সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদের জন্য ব্যাংক ড্রাফ করেছিলেন ৩১জন প্রার্থী। কিন্তু ইন্টারভিউয়ের জন্য মাত্র ৬ জন প্রার্থীকে ডাকা হয় এবং লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হন চাপুইর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক শরিফুল ইসলাম, পরে ভাইবাতে শরিফুল ইসলামকে অনুপস্থিত দেখিয়ে রফিকুলকে প্রথম ঘোষণা করা হয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিজ স্কুলের শিক্ষক থাকা এবং নিয়োগের বৈধতা বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুবুল হুদা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় সাবেক প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ খান বলেন আমার স্কুলের শিক্ষক মো: আলী এখানে পরীক্ষা দিবেন আমি জানতাম না কারণ উনি স্কুল থেকে অনুমতি নিয়ে আবেদন করেননি। আর ২৫ জন কে কেন ডাকেনি সেটা স্কুল কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। তাছাড়া অনেক আগের ঘটনা তো তাই অনেক কিছু মনে নেই।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পেয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের আশীর্বাদপুষ্ঠ হয়ে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির প্রত্যক্ষ মদদে রফিকুল ইসলাম বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নজির বিন স্বজন প্রীতি, লাঠিয়াল বাহিনী ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।রফিকুল ইসলাম এর অর্থ আত্মসাৎ এর বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায় বিদ্যালয়ের দুটি ব্যাংক হিসাবের দিকে নজর দিলেই, বিদ্যালয়ের নামে এবং বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন রামকানাই মার্কেটের নামে দুটি পৃথক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুর নূরের বরখাস্ত হওয়ার সময় বিদ্যালয়ের একাউন্টে ছিল প্রায় ১৯ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা, এবং মার্কেটের নামে একাউন্টে ছিল ৬ লক্ষ টাকা। কিন্তু বর্তমানে রফিকুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী স্কুলের একাউন্টে আছে ২ লক্ষ ৫৯ হাজার টাকা, এবং মার্কেট একাউন্টে আছে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মানও নিম্নমুখী ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র থাকলেও এখন সেটাও নেই। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত স্কুল অনুযায়ী আশানুরূপ শিক্ষার্থীও নেই, শিক্ষার মান নিম্নমুখী হওয়ায় বাড়ছে না শিক্ষার্থীর সংখ্যা।বর্তমানে বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান সম্পর্কে অর্থ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শতবর্ষ পুরনো এই বিদ্যালয়ে সর্বনাশের শুরুটা হয়েছিল বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল হক সেন্টুর হাত ধরে, আর গত অর্ধ যুগ যাবত বিদ্যালয়ের কফিনের শেষ পেরেক ঠুকাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম।
প্রধান শিক্ষক আব্দুল নূরের কাছে জানতে চাইলে, তিনি বলেন রফিক কমিটির সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করে সম্পূর্ণ অন্যায় ভাবে আমাকে বিদ্যালয় থেকে বের করে আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে,অথচ বারবার মামলার রায় আমার পক্ষে পেয়েও তার ভন্ডামীর কারণে স্কুলে ঢুকতে পারিনি।শুধু আমার সাথে না,মোস্তাক আব্বাস উদ্দিন সহ আরও অনেকের সঙ্গে সে অবিচার করছে এবং তার নামে মামলা ও হয়েছে।অনুসন্ধানের রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলার সত্যতা বেরিয়ে আসে, জানা যায় ২০১৭ সালের ২৪শে আগস্ট ম্যানেজিং কমিটির তৎকালীন সভাপতি আশরাফুল ইমাম রানা ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম, বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান ও সহকারী শিক্ষক মোস্তাক আহমেদের কাছ থেকে সাদা কাগজের সাক্ষর রেখে প্রান নাশের হুমকি দিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেন, এই ঘটনার তিনদিন পর মোস্তাক আহমেদ রফিকসহ বাঁদিদেরকে অভিযুক্ত করে সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন, ডায়েরি নং -১৬৮৭।পরবর্তীতে তাদের বিচার চেয়ে এবং চাকরি ফিরে পেতে মুস্তাক আহমেদ একই বছরের ১৭ই সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা করেন, মামলা নং -৩০৮/১৭এবং পরবর্তীতে কোট বদলি হয়ে মামলা নং ৪৮/১৯।২০০২২ সালে মোস্তাক আহমেদ তার পক্ষে মামলার রায় পেলে, রফিকুল ইসলাম তাকে বিদ্যালয়ে যোগদান না দিয়ে আড়াই বছর যাবত বিভিন্ন তালবাহানা করে,পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাধ্য হয়ে রফিকুল ইসলাম মোস্তাক আহমেদ বিদ্যালয়ে যোগদানের অনুমতি দেন।
রফিকুলের মামলা বাজির বিষয়ে জানতে চাইলে, সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জীবন ভট্টাচার্য বলেন,ব্যাপারটি আমি ভালোভাবেই জানি কিন্তু বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি যদি তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেই তাহলে এখানে আমি নিরুপায়।