
নিজস্ব প্রতিবেদক.
শহীদ মিনার বাংলাদেশের কাছে শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়—এটি জাতির বিবেকের প্রতীক। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া মানুষের আত্মত্যাগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং মানুষের মর্যাদার অঙ্গীকার যেন তার প্রতিটি ইটের সঙ্গে মিশে আছে।
তাই সেই শহীদ মিনারের ছায়াতেই যখন সহিংসতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়, যখন রাজপথে মানুষের রক্ত ঝরে, তখন প্রশ্নটি শুধু রাজনীতির থাকে না; প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায় একটি জাতির বিবেকের সামনে—
বাংলাদেশ কি সত্যিই তার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে?
ক্ষমতার চেয়ার বদলায়, স্লোগান বদলায়, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলায়; কিন্তু প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবার মানসিকতা যদি থেকে যায়, তবে পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক। রাষ্ট্রের পোশাক বদলায়, চরিত্র বদলায় না।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সবাই একমত হওয়ায় নয়; ভিন্নমতের মানুষের পাশাপাশি বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করায়।
একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নন। যেদিন রাজনীতি এই সত্য ভুলে যায়, সেদিন যুক্তির জায়গা নেয় হুমকি, সংলাপের জায়গা নেয় সংঘাত, আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রূপ নেয় অস্তিত্বের লড়াইয়ে।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো—একসময় সমাজ সহিংসতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
একটি লাশ তখন আর মানুষ থাকে না; হয়ে যায় একটি সংখ্যা—‘এ পক্ষের’ অথবা ‘ও পক্ষের’।
কিন্তু মৃত্যুর কোনো দল নেই।
একজন নিহত মানুষ প্রথমত একজন মানুষ। তার রাজনৈতিক পরিচয় পরে; মানবিক পরিচয় আগে।
একটি গুলিতে যখন একটি প্রাণ নিভে যায়, তখন শুধু একজন মানুষ মারা যায় না; ভেঙে পড়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন, বদলে যায় একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, চিরস্থায়ী হয় কোনো মায়ের অপেক্ষা।
একটি লাশ মানে একটি অসমাপ্ত জীবনের ইতিহাস।
ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা—কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু রক্তের স্মৃতি থেকে যায়।
একজন মায়ের কান্না কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। একটি অন্যায় হত্যার স্মৃতি কোনো নির্বাচনী স্লোগানের চেয়ে শক্তিশালী।
তাই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, জনগণের আস্থায়। আর জনগণের আস্থা হারিয়ে গেলে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাকাঠামোও ভিতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে মানুষ অন্যায়, বৈষম্য ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য ক্ষমতার পালাবদলে নয়—রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে।
কারণ ক্ষমতা অর্জন যতটা কঠিন, ক্ষমতাকে সংযত রাখা তার চেয়েও কঠিন।
ক্ষমতার সামনে দুটি পথ থাকে—প্রতিশোধের পথ এবং রাষ্ট্র নির্মাণের পথ। প্রথমটি সহজ, দ্বিতীয়টি কঠিন।
প্রতিশোধ নিতে শক্তি লাগে; কিন্তু ক্ষমা করতে লাগে চরিত্র। প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে ক্ষমতা লাগে; তার অধিকার রক্ষা করতে লাগে মহত্ত্ব।
তাই সত্যিকারের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার মধ্যে নয়; ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতার মধ্যে।
সংলাপ দুর্বলতা নয়।
সহনশীলতা পরাজয় নয়।
ক্ষমা আত্মসমর্পণ নয়।
বরং প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধের পথ থেকে সরে আসাই সভ্যতার বড় বিজয়।
নয়তো চলতেই থাকবে প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের খেলা। সেখানে অপরাধী ও নিরপরাধ—কেউই নিরাপত্তাবোধ করবে না। ভয় ও আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়বে পরিবার, অস্থির হবে সমাজ, আর শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রের স্বার্থ।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন সেই নৈতিক সাহস।
প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে নিজ দলের অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস থাকবে, প্রতিপক্ষের ন্যায়সঙ্গত কথাটুকু স্বীকার করার উদারতা থাকবে এবং অন্য দলের মানুষের জীবনকেও সমান মূল্যবান মনে করার মানবিকতা থাকবে।
শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া সহজ; কঠিন হলো শহীদদের আদর্শকে রাষ্ট্রের আচরণে প্রতিষ্ঠা করা।
শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো—এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে কোনো মা রাজনৈতিক সহিংসতায় সন্তান হারাবেন না, কোনো তরুণ নিজের কথা বলার কারণে আতঙ্কে থাকবে না এবং কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।
কারণ লাশের ওপর দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের প্রাসাদ নির্মাণ করা যায় না।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রয়োজন প্রতিহিংসার বদলে ন্যায়বিচার, সংঘাতের বদলে সংলাপ, আধিপত্যের বদলে সহমর্মিতা।
প্রয়োজন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানুষ বড়, দলের চেয়ে রাষ্ট্র বড় এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন ও মর্যাদা।
একদিন ক্ষমতার পদ থাকবে না, রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না। থেকে যাবে শুধু একটি প্রশ্ন—
বাংলাদেশকে কেমন দেশ হিসেবে রেখে যাওয়া হলো?
হয়তো শহীদ মিনারের নীরব পাথর একদিন সেই প্রশ্নই করবে—
“তোমরা কি শহীদদের রক্তের মর্যাদা রাখতে পেরেছ?”
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো স্লোগানে নয়; দিতে হবে রাজনীতিতে, রাষ্ট্রচিন্তায়, সামাজিক আচরণে এবং মানবিকতায়।
কারণ একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার অর্থনীতি, অস্ত্র কিংবা ক্ষমতা নয়।
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে তার মানুষের জীবনকে কতটা মূল্য দেয়।
মানচিত্রের রং যেন আর রক্তে গাঢ় না হয়।
বাংলাদেশ হোক প্রতিহিংসার নয়—মানবিকতার।
ক্ষমতার নয়—মানুষের।
ভয়ের নয়—মর্যাদার।
এই হোক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।