
ফখর উদ্দিন ইমরান,বিশেষ প্রতিবেদক
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে শুরু হয়েছে মেলা।মেলার নাম কুড়িগাই।এ মেলার পেছনে রয়েছে শত বছরের ইতিহাস। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছরের মতো এবারও হচ্ছে মেলা।এ ঐতিহ্যবাহী কুড়িখাই মেলার প্রচলন হয়েছে প্রায় চারশ বছর আগে।আধ্যাত্মিক সাধক শাহ শামসুদ্দিন বুখারি (রহ.) এর উরস উপলক্ষে এ মেলা শুরু হয়। সপ্তাহব্যাপী এ মেলায় রকমারি পণ্য ছাড়াও বড় আকারের মাছ দৃষ্টি কাড়ছে দর্শনার্থীদের।বাউল সাধকদের আধ্যাত্মিক গান ও সুরের মূর্ছনায় মেলা প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন আবহ।মেলা ঘিরে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে পুরো এলাকায়।৩৬০ জন আউয়ালিয়ার শিরোমনি শাহ জালালের (রহ.) সফর সঙ্গী হযরত শাহ শামছুদ্দিন বুখারী (রহ.) বাংলা ১২২৫ সালে তিনজন সঙ্গী নিয়ে কটিয়াদী উপজেলার কুড়িখাই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন এবং তিনিই এ অঞ্চলের প্রথম ইসলাম ধর্মের প্রচারক। এছাড়া তিনি ছিলেন বার আউলিয়ার একজন।
জানা গেছে, প্রায় চারশ বছর আগে কটিয়াদী উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের কুড়িখাই এলাকায় আস্তানা গাড়েন ১২ আউলিয়ার অন্যতম আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শাহ সামছুদ্দীন আউলিয়া সুলতানুল বুখারি (রহ.)। তার মৃত্যুর পর সেখানে গড়ে ওঠে মাজার। প্রতি বছর হজরত শাহ সামছুদ্দীন আউলিয়া সুলতানুল বুখারি (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে বাৎসরিক উরস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মুরিদ ও সাধকরা এখানে জড়ো হন। সেই থেকে মাজার সংলগ্ন খোলা ময়দানে প্রতি বছর বসে কুড়িখাই মেলা। শত বছরের পুরোনো এ মেলায় ঢল নামে লাখো মানুষের।
মঙ্গলবার (১১ফেব্রুয়ারি) থেকে মেলা শুরু হয়েছে, চলবে ০৭ দিনব্যাপী। কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলা সদর থেকে ৩ কিমি ভিতরে পল্লী গ্রাম কুড়িগাই এ মেলাটি হচ্ছে।এ মেলার মাছে নতুন জামাইকে বরণ করে নেওয়া হয়।মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের ৫০টি গ্রামে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে।প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে মেলার স্টল বসেছে।এ মেলার মূল আকর্ষণ জামাই-বউ মাছের মেলা।প্রথা আছে,এ মেলা থেকে ৪০ গ্রামের জামাইরা মাছ কিনে আনেন।এলাকার রীতি অনুযায়ী জামাইরা এ মেলা চলার সময় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন।মেলা থেকে সবচেয়ে ভালো ও বড় আকারের মাছটি কিনে তবেই তারা যাবেন শ্বশুরবাড়িতে।তাই দেশের নানা এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা মাছের পসরা নিয়ে বসেছেন মেলা প্রাঙ্গণে।কে সবচেয়ে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাবেন,এ নিয়ে জামাইদের মধ্যে চলে নিরব প্রতিযোগিতা।কিশোরগঞ্জ ও কটিয়াদী ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রতি বছরের মাঘ মাসের শেষ মঙ্গলবার থেকে এ মেলা শুরু হয়।মেলা ঘুরে দেখা যায়- মেলায় মানুষের ঢল নেমেছে। মিষ্টি, খেলনা, মিঠাই-মণ্ডা, ফিরনি-বাতাসা, বিন্নি খই পাওয়া যাচ্ছে।এ ছাড়াও সার্কাস, পুতুলনাচ ও নাগর দোলাসহ বিনোদনের সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নানা শ্রেণি আর বয়সের লোকজন মেলায় আসছেন। বড়দের হাত ধরে মেলায় আসছে শিশুরাও। সবকিছু ছাপিয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, মেলায় বসা মাছের বাজার।অত্র ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও মেলা উদযাপন কমিটির সমন্বয়ক মোঃ হাদিউল ইসলাম জানান কয়েক শত বছরের পুরনো কুড়িগাই মেলাটি আমাদের এই অঞ্চলের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। মেলার পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যাবস্হা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।মেলায় আসা দোকানিদের অভিযোগ হচ্ছে, জায়গা পেতে তাদের মোটা অংকের টাকা দিতে হয় মেলা কমিটিকে। আশপাশের জায়গার মালিকরাও অতিরিক্ত টাকা আদায় করে থাকেন। ফলে এর প্রভাব পড়ে জিনিসপত্রের দামে। এছাড়াও মেলায় চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ব্যাবসায়ীরা।মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাঈদুল ইসলাম বলেন, শাহ শামসুদ্দিন বুখারির (রহ.) মাজারের ওরশকে কেন্দ্র করে ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী কুড়িখাই মেলার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে এলাকার জনগণ। মেলায় কোন ধরনের ঝামেলা করতে দেওয়া হবে না। মেলার পরিবেশ ঠিক রাখতে আমাদেরকে যা যা করার দরকার আমরা তার সকল কিছু করবো। মেলার জিনিসপত্রের মূল্য স্বাভাবিক রাখতে খেয়াল রাখা হবে।মেলায় জোয়া ও মাদকের বিষয়ে তিনি বলেন, মেলা কমিটির সভাপতি যেহেতু উপজেলা প্রশাসন, সেখানে জোয়া মাদকেরতো প্রশ্নই আসেনা। এসকল বিষয় আমরা সার্বক্ষনিক গোয়েন্দা নজরদারীতে রাখছি।