
সুমন ভট্টাচার্য-সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার.
টানা সাড়ে আট ঘণ্টার ভারী বর্ষণে ময়মনসিংহ নগরী কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বুধবার সকালে নগরীর অধিকাংশ সড়ক ও নিচু এলাকায় হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এতে অফিসগামী মানুষ,শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও হাসপাতালগামী রোগীসহ লাখো নগরবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েন। জলাবদ্ধতার জন্য অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র সাড়ে আট ঘণ্টায় ময়মনসিংহে ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এটি চলতি বছরে জেলার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত।পরিস্থিতি মোকাবিলায় বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন নিজেই কর্মীদের সঙ্গে পানিতে নেমে বিভিন্ন এলাকার ড্রেন পরিষ্কার ও পানিনিষ্কাশনের কাজ তদারকি করেন।সরেজমিনে দেখা যায়, সানকিপাড়া, আকুয়া,গোলকিবাড়ী, বলাশপুর, চরপাড়া, খাগডহর, গাঙ্গিনারপাড়, নতুন বাজার, জেলা স্কুল মোড় ও কেওয়াটখালী আমলাপাড়াসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা বিকল হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন হাসপাতালগামী রোগী ও স্বজনরা।চরপাড়া মোড়ে রোগী নিয়ে আটকে পড়া আলম বলেন, “অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে কয়েকশ মিটার রাস্তা পার হতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। হাসপাতালে পানি ঢুকে রোগীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।”এলাকার ব্যবসায়ী খোকন বলেন, “ড্রেনের মাঝখানে বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিয়মিত কর দিলেও নাগরিক সুবিধা পাচ্ছি না।”মসিক প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, “অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি বহুতল ভবন থেকে ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ফেলা, অতীতের অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অনেক এলাকায় ড্রেন না থাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকার পানি নেমে গেছে। যেখানে এখনও পানি রয়েছে, সেখানে দ্রুত নিষ্কাশনের কাজ চলছে।”তিনি আরও বলেন, “দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিনের মধ্যে আকুয়া খালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ সচল করা হয়েছে। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩২২ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পের মাত্র ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।মসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মিঞা বলেন, “অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পর্যাপ্ত খালের অভাব জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। খালগুলোর সঙ্গে নদীর সংযোগ স্থাপনের একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হবে।”নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নয়, খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে ময়মনসিংহে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।