
ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মহাফেজখানায় সরকারি দলিল ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডের তল্লাশি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত নকল ফি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতাদের কেউ কেউ। পাশাপাশি পুরোনো নথি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় একক কর্মচারীর প্রভাব এবং অফিস সময়ের পরও দীর্ঘক্ষণ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সদর রেজিস্ট্রি মহাফেজখানার রেকর্ড কিপার মিজানুর রহমান। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন।
নকলের ফি নিয়ে প্রশ্ন সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা আদায় করা হচ্ছে। ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকার নকলের জন্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত অর্থের হিসাব, সরকারি ফি-তালিকা এবং অর্থ গ্রহণের রসিদ যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ নেওয়া হলে তার বৈধ ভিত্তি কী এবং অতিরিক্ত অর্থের বিপরীতে সেবাগ্রহীতাদের রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না।
দুই-তিন বছরের পুরোনো নথি পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা
ভুক্তভোগীদের দাবি, দুই-তিন বছরের পুরোনো দলিল বা নথির তল্লাশি চাইলে অনেক সময় দেড় থেকে দুই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। পর্যাপ্ত তল্লাশি-সংক্রান্ত বইয়ের অভাব এবং পুরোনো রেকর্ড খুঁজে বের করার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
তবে নথি পেতে দীর্ঘসূত্রতার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং জনবল ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রাত ৮টা পর্যন্ত অফিসে অবস্থানের অভিযোগ রেকর্ড কিপার মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অফিস সময় শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘক্ষণ মহাফেজখানায় অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো দিন তাঁকে রাত ৮টা পর্যন্ত অফিসে থাকতে এবং বহিরাগতদের সঙ্গে সময় কাটাতে দেখা যায়। এ সময় অফিসের কেচি গেট বন্ধ রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পর সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে অবস্থানের অনুমোদন রয়েছে কি না এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়—এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জমি-জমা ও ফ্ল্যাটের সম্পদের উৎস যাচাইয়ের দাবি
মিজানুর রহমানের জমি-জমা ও ফ্ল্যাটের মালিকানা এবং সম্পদ অর্জনের উৎস নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, তাঁর বৈধ আয়, সম্পদ অর্জনের সময়কাল এবং সম্পদের উৎসের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সম্পদ বিবরণী, ভূমি রেকর্ড, দলিলপত্র এবং প্রাসঙ্গিক আর্থিক নথি যাচাই করা জরুরি। কেবল অভিযোগ বা আলোচনা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ নয়।
গফরগাঁওয়ে দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ এর আগে গফরগাঁওয়ে দায়িত্ব পালনকালে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি, মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া না গেলে এর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই পূর্ববর্তী কর্মস্থলের দায়িত্বকালীন নথি ও অভিযোগের রেকর্ড যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
প্রশাসনিক নজরদারি কতটা কার্যকর?সরকারি দলিল ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড সংরক্ষণ এবং তল্লাশির মতো সংবেদনশীল দায়িত্বে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি, দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতাদের কেউ কেউ।
তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে—নির্ধারিত ফি ও আদায়কৃত অর্থের হিসাব যাচাই, রসিদ পরীক্ষা, তল্লাশি-সংক্রান্ত বই ও পুরোনো নথি ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা, অফিস সময়ের পর অবস্থানের কারণ অনুসন্ধান এবং প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সম্পদের তথ্য যাচাই।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় তদন্ত করবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থানও স্পষ্ট করা হবে।
সরকারি নথি ও দলিলের তল্লাশি সেবা মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। এ সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অযৌক্তিক বিলম্ব কিংবা নথি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।